মাদক সমাজ ও সভ্যতা ধ্বংস করে

মাদকাসক্তি বলতে মাদকদ্রব্যের প্রতি প্রচণ্ড আসক্তি বা নেশাকে বুঝায়। যেসব দ্রব্য সেবন বা পান করলে তীব্র নেশার সৃষ্টি হয় সেগুলো মাদকদ্রব্য। কোন কোন ঔষধকে ব্যবহারগত কারণে মাদকদ্রব্য বলা হয়। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোন ঔষধ অতিরিক্ত সেবন করলে এবং এর প্রতি আসক্তি জন্মালে সেটাও মাদকের আওতায় পড়ে। অতএব যেসব দ্রব্য সেবন করলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে এবং সেগুলোর প্রতি সেবনকারীর প্রবল আসক্তি জন্মে সেগুলোই হল মাদকদ্রব্য। যেমন – বিড়ি, সিগারেট, চুরুট, মদ, গাঁজা, ভাং, আফিম, হেরোইন, পেথিডিন, ফেনসিডিল ইত্যাদি। যারা মাদকদ্রব্য সেবন করে মাদকদ্রব্যের প্রতি তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হয়। তারা মাদকদ্রব্য সেবন করা থেকে বিরত থাকতে পারে না। যদি কোন কারণে তারা মাদক গ্রহণ করতে না পারে, তাদের মধ্যে মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক উপসর্গের সৃষ্টি হয়। যেমন – মেজাজ খিটখিটে হয়, ক্ষুধা ও রক্তচাপ কমে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয়, নিদ্রাহীনতা দেখা দেয়, আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।

যারা মাদকসেবী তারা বিভিন্ন পদ্ধতি ও মাধ্যমে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে থাকে। যেমন ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানো, ট্যাবলেট, পাঊডার, সিরাপ হিসেবে খাওয়া, পানীয় হিসাবে পান করা, ধূমপানের মাধ্যমে গ্রহণ করা। ধূমপানের ও আবার নানা ধরন আছে। যেমন – সিগারেট, বিড়ি, চুরুট, হুঁকা ইত্যাদি।



তামাক ও মাদকদ্রব্য সেবন বলতে প্রধানত ধূমপানকে বুঝায়। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে পৃথিবীতে প্রতি ৮ সেকেন্ডে শুধু ধূমপানজনিত কারণে একজন ব্যক্তির মৃত্যু হচ্ছে। যারা ধূমপান করে ও ধূমপায়ী ব্যক্তির ছেড়ে দেওয়া ধোঁয়া থেকে অন্যরা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মাদকদ্রব্য সেবনের কুফলসমূহ-


  •  পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে যন্ত্রনাদায়ক প্রভাব ফেলে। মাদকসেবী পরিবারের সদস্যদের সাথে উগ্র আচরণ করে, পরিবারের শান্তি বিনষ্ট করে।



  • মাদকদ্রব্য মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। যেমন – শেখার ও কাজ করার ক্ষমতা হ্রাস করে, চাপ সহ্য করার ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। তাছাড়া মানসিক পীড়ন বাড়িয়ে দেয়।



  •  আর্থিক ক্ষতি হয়। নেশার টাকা যোগাতে গিয়ে সংসারে অভাব ও অশান্তির সৃষ্টি হয়।



  • কিছু কিছু মাদক এইচআইভি ও হেপাটাইটিস-বি এর সংক্রমণের আশংকা বাড়িয়ে দেয়। খাদ্যনালী ও ফুসফুসের ক্যান্সার, কিডনীর রোগ, রক্তচাপ প্রভৃতি রোগের সৃষ্টি করে।



  • শারীরিক সুস্থতার ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করে। মাদকদ্রব্য সেবন মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকে ধ্বংস করে, খাদ্যাভাস নষ্ট করে। চোখের দৃষ্টি শক্তি কমিয়ে দেয়।

মাদকাসক্তি বর্তমান সমাজের একটি বড় সমস্যা। যারা মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে তারা তাৎক্ষণিক মৃত্যুমুখে পতিত হয় না বটে, কিন্তু মাদক গ্রহণের কারণে তারা নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয়। মাদকের কারণে শুধু যে মাদকাসক্ত ব্যক্তিই ক্ষতগ্রস্ত হয় তা নয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তির বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলেমেয়ে, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবার জীবনে প্রভাব পড়ে। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা মাদকের অর্থ জোগাড় করার জন্য চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানিসহ বিভিন্ন অসামাজিক বেআইনি কাজকর্মে লিপ্ত হয় যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতির জন্য খুব ক্ষতিকর। মাদকাসক্তির ভয়াবহ পরিণাম থেকে যুব সমাজসহ দেশের সবাইকে রক্ষা করতে হলে মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। মাদকদ্রব্য যাতে সহজে পাওয়া না যায় তার জন্য যে আইন আছে তা যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন আইন তৈরি করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন করে তুলতে জনমত গঠন করতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, ধ্বংস ডেকে আনা ছাড়াও মাদকাসক্তি প্রচলিত মূল্যবোধ, জীবনশৈলী ও অর্থনীতির প্রভূত ক্ষতি করছে। তাই সমগ্র বিশ্ববাসীকে মাদক বিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার করার মাধ্যদিয়ে এ ক্ষতিকর মাদকের হাত থেকে ছাত্র সমাজকে বাঁচাতে হবে। নতুবা মাদকাসক্তির ফলে ধ্বংস হবে ছাত্র সমাজ, বিনষ্ট হবে আধুনিক সভ্যতা।

লিখেছেন-
মো: সাঈদ মাহাদী সেকেন্দার।
শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: mahadey729@gmail.com

No comments

সর্বশেষ আপডেট

ড. এ কে আব্দুল মোমেন এর জীবনালেখ্য

Powered by Blogger.