সমালোচনা থেকে শিক্ষা নিয়ে রইস স্যার কি হয়ে উঠতে পারেন জবির গুরুত্বপূর্ণ উপাচার্য?
গত দুই দিনে সারা দেশে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। তবে এই সমালোচনা উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইস উদ্দিন স্যারকে নতুন করে ভাবনার সুযোগ করে দিয়েছে বলে আমি মনে করি। প্রশ্ন হলো, এই ঘটনায় উপাচার্য কতটুকু দায়ী? অন্য কোনো উপাচার্য হলে হয়তো ঘটনাটিকে আরও দীর্ঘায়িত করে পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারতেন। কিন্তু রইস স্যার নোটিশ জারির পরপরই তা বাতিল করেছেন। তাঁর এই উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। অন্তত নিজের বিবেচনাবোধ কাজে লাগিয়ে তিনি পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পেরেছেন।
এ কারণে তাঁর প্রতি ক্ষোভ অনেকাংশে কমেছে। রইস স্যার বলেই হয়তো তিনি বিষয়টি এভাবে সামাল দিতে পেরেছেন। অন্য কেউ হলে একইভাবে ভুল স্বীকার করে বা সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে পরিস্থিতি সামাল দিতেন কি না, তা নিয়ে আমার সংশয় রয়েছে। বরং কেউ কেউ অনড় অবস্থানে থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারতেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রইস স্যারের অবদানও কম নয়। তিনি আমাদেরই সহযোদ্ধা ছিলেন। আমাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি রাস্তায় মার খেয়ে আহত হয়েছেন। একজন উপাচার্যের ক্ষেত্রে অতীতের সেই অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক। কারণ, যে ক্যাম্পাসের মানুষের সঙ্গে তিনি একসময় আন্দোলন করেছেন, সেই ক্যাম্পাসেরই উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তাঁর জন্য এক ভিন্ন বাস্তবতা।
এরপর আসে পরবর্তী দুই দিনের কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ। উপাচার্য কাউকে বাধা দেননি, এমনকি গরু জবাই বন্ধ করারও চেষ্টা করেননি। আমার ধারণা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি ও মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা থেকেই তিনি পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বুঝতে পেরেছেন। গরু জবাই বন্ধ করতে গেলে পরিস্থিতির বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে - এমন আশঙ্কা থেকেই হয়তো তিনি সংযত থেকেছেন। তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন, কিন্তু কোনো বিতর্কিত মন্তব্য করেননি। এসব কারণে পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে বলে আমার মনে হয়।
রইস স্যারের সমালোচনা আমরা যেমন করি, তেমনি তাঁর অর্জনগুলোকেও স্বীকার করি এবং ভবিষ্যতেও করব। তাঁর ব্যর্থতা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও অগ্রগতিকে ব্যাহত করতে পারে - এ বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় রাখা উচিত। কিন্তু এই ঘটনার আরেকটি দিক আমাকে ভাবিয়েছে। সংকটের সময়ে উপাচার্যকে কার্যত কারও দৃশ্যমান সমর্থন পেতে দেখা যায়নি।
এত দিন বিভিন্ন মহলের সমর্থন ও তাঁর অর্জিত গ্রহণযোগ্যতা উপাচার্যকে বিতর্কের বাইরে থাকতে সহায়তা করেছে বলে মনে করি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা তাঁকে নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ দিয়েছে - শুধু প্রশাসন কিংবা কোনো ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেই চলবে না; বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে সংযোগ ও আস্থা তৈরি করাও জরুরি। আমার কাছে মনে হয়েছে, রইস স্যার সেই উপলব্ধি থেকেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছেন।
আগামী দিনে এই অভিজ্ঞতাগুলোকে শিক্ষা হিসেবে কাজে লাগাতে পারলে রইস স্যার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাচার্য হয়ে উঠতে পারেন—এমন বিশ্বাস আমার রয়েছে। তবে তাঁর আশপাশের কিছু মানুষের ভুল পরামর্শ বা সিদ্ধান্ত তাঁকে কখনো কখনো বিপদে ফেলতে পারে। আমার দৃষ্টিতে, এটিই তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। উপাচার্যের উচিত হবে, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিভিন্ন পক্ষের মতামত শোনা এবং শিক্ষার্থীদের মনোভাব যথাযথভাবে অনুধাবন করা।
আমি চাই, আগের সেই রইস স্যার আবারও আমাদের সহযোদ্ধা হিসেবেই আমাদের পাশে থাকুন। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উপাচার্য, প্রশাসন কিংবা কোনো একটি পক্ষের একক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে না। একটি সুন্দর, কার্যকর ও শিক্ষার্থীবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
সমালোচনা হোক, তবে তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হোক। রইস স্যার যদি এই ঘটনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সবার আস্থা অর্জন করতে পারেন, তাহলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তা হবে ইতিবাচক একটি অগ্রযাত্রা।
কৃতজ্ঞতা: জবিয়ানস - JnU'ins পেইজ

No comments