বন্ধ্যাত্ব | লেখক - ডাঃ রওশন আরা (বন্ধ্যাত্ব, প্রজনন হরমোন, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ)
যদি কারো আগে থেকেই স্ত্রী রোগের সমস্যা অথবা শারীরিক সম্পর্কের অসুবিধা জানা থাকে সেক্ষেত্রে ৬ মাস বা ১ বছর অপেক্ষা করার দরকার নেই, সন্তান ধারণের পরিকল্পনা করলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন। যারা অনেকদিন ধরে চেষ্টা করছেন কিন্তু গর্ভধারণ হচ্ছে না তাদের কাছে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন থাকে কেন হচ্ছে না? অনেকেই মনে করেন বন্ধ্যাত্ব একটি অভিশাপ, এর কোনো সমাধান নেই। আরেকটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, বন্ধ্যাত্বের কারণ শুধু নারীরাই, পুরুষ বন্ধ্যাত্ব বলে কিছু নেই। গবেষণায় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায় যে, নারী এবং পুরুষ বন্ধ্যাত্বের জন্য সমানভাবে দায়ী। দেখা যায় নারীদের সমস্যা ২০-৪০ শতাংশ, পুরুষের সমস্যা ৩০ শতাংশ, উভয়ের সমস্যা ১০ শতাংশ এবং কারণ অজানা ১০-৩০ শতাংশ। সর্বশেষ গ্রুপটিকে আখ্যায়িত করা হয় ব্যাখ্যাহীন বন্ধ্যাত্ব বলে। তবে এই গ্রুপটির সূক্ষ্ম পর্যায়ের কিছু সমস্যা থাকে, যা কিনা সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে না। বন্ধ্যাত্বের (ইনফার্টিলিটি) কারণ বুঝতে হলে আগে আমাদের জানতে হবে নরমাল হিউম্যান রিপ্রোডাকশন বা প্রেগন্যান্সি আসে কিভাবে?
মহিলা প্রজননতন্ত্র মডেলটি যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যায় যে, তাদের প্রজননতন্ত্রে ১টি জরায়ু বা বাচ্চার দানি থাকে। বাচ্চার দানির দু'পাশে থাকে দুটি ডিম্বনালী এবং দুটি ডিম্বথলী। প্রত্যেক মাসে যে কোনো একটি ডিম্বথলী থেকে ফলিকল ফাটিয়ে ডিম নিঃসরণ হয়। ডিম নিঃসরণ হলে ডিম্বনালী তার শেষ প্রান্তে আঙ্গুলের মতো অংশটি দিয়ে ডিমটিকে ধরে ফেলে এবং ডিম্বনালীর ভেতর ঢুকায়। এই সময় স্বামী-স্ত্রীর মিলন হলে অসংখ্য শুক্রকীট যোনীপথে পড়ে এবং শুক্রকীটগুলো সাঁতার কাটার মতো করে দ্রুত গতিতে ডিম্বকোষের কাছে পৌঁছায়। উদ্দেশ্য ডিমকে নিষিক্তকরণ। যদিও ১টি মাত্র শুক্রকীট ডিমকে নিষিক্ত করে। কিন্তু সেই শুক্রকীটটিকে সহায়তা করার জন্য অসংখ্য শুক্রকীটের প্রয়োজন হয়। এর জন্য শুক্রকীটগুলোর সংখ্যায় বেশি হতে হয়, সক্রিয়ভাবে দ্রুতগতিসম্পন্ন ও স্বাভাবিক আকৃতির হতে হয়। গর্ভধারণের জন্য লাগে একটি সুস্থ ডিম এবং সুস্থ শুক্রকীট। শুক্রকীটটি ডিমকে ফেলোপিয়ান টিউবের মধ্যে নিষিক্ত করলে সেখানে একটি ভ্রুণের সঞ্চার (সৃষ্টি) হয়। ৩-৪ দিন পর ভ্রুণটি গড়িয়ে যেয়ে জরায়ুতে বাসা বাধে; একে বলে ইমপ্লানটেশন। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, বিশ্বে প্রতি ৬ জনের ১ জন বন্ধ্যাত্বে ভুগছে এবং উন্নয়নশীল দেশে ১৭ শতাংশ মানুষ বন্ধ্যাত্বের শিকার। এটি প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি রোগ।
মহিলাদের যেসব কারণে বন্ধ্যাত্ব হয় সেগুলো হলো-
প্রথমত: ডিমের সমস্যা, হতে পারে ওভুলেশন ডিসঅর্ডার অথবা এমন কোনো হরমোনজনিত সমস্যা, যাতে ডিম নিঃসরণ হচ্ছে না। অথবা ডিমের সংখ্যা কম থাকতে পারে- এজ রিলেটেড অর্থাৎ বয়সজনিত বা অসুস্থতার কারণে। বয়সের সাথে সাথে ওভারিতে ডিমের সংখ্যা কমতে থাকে এবং গুণগত মান হ্রাস পেতে থাকে। ডিম্বাশয়ে কোনো ডিজিজ বিশেষ করে এন্ডোমেট্রিওমা (চকলেট সিস্ট), ইনফেকশন এগুলোর দ্বারা ওভারিয়ান ফলিকল নষ্ট হতে পারে, এগুলোর কারণেও ওভুলেশন ব্যাহত হতে পারে এবং ডিমের কোয়ালিটিও খারাপ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত: ডিম্বনালী বা ফ্যালোপিয়ান টিউবের সমস্যা। টিউবের মধ্যে কিছু সিলিয়া থাকে। ইনফেকশন হলে সিলিয়াগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এন্ডোমেট্রোসিস হলে ডিম্বথলী এবং ডিম্বনালীর সহ অবস্থান নষ্ট হয়, ফলে ডিম্বনালী ডিম্বথলী থেকে ডিম ধরতে (ক্যাপচার) করতে পারে না। ডিমের নিজের কোন লেজ নেই, ডিম্বনালীর মধ্যে সিলিয়ার মাধ্যমে স্রোতের সৃষ্টি হয় এবং ডিমটি ডিম্বনালীর মধ্যে নিষিক্ত হওয়ার স্থানে পৌঁছায়। ইনফেকশন বা এন্ডোমেট্রিওসিস এর কারণে টিউবের নরমাল মোটিলিটি নষ্ট হয়, ফলে ওভাম বা ডিমটি টিউবের (ডিম্বনালীর) মধ্য দিয়ে সরতে পারে না।
তৃতীয়ত: জরায়ুর (ইউটেরাস) গহ্বরের সমস্যা- জরায়ুর গহ্বরের মধ্যে এন্ডোমেট্রিয়াল পলিপ বা ফাইব্রোয়েড পলিপ বা মাংসপেশির লেয়ারের মধ্যে এডিনোমায়োসিস হলে এমব্রায়ো বা ভ্রুণ ইমপ্লানটেশনে বাধাগ্রস্থ হয়। অনেক সময় জরায়ুর গহ্বরের মধ্যে জন্মগতভাবে ব্যবধায়ক পর্দা থাকে। সেটা যদি অনেক লম্বা হয়, ইমপ্লানটেশন হলেও গর্ভপাত হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে।
চতুর্থত: সার্ভিক্যাল ফ্যাক্টর বা জরায়ুর মুখের সমস্যা- যদি পূর্বের কোনো অপারেশন (LEEP), বা টিউমারের কারণে জরায়ুর মুখ বন্ধ থাকে তখন শুক্রকীট জরায়ুতে প্রবেশ করতে পারে না।
এখন আসি পুরুষের বন্ধ্যাত্বের কারণগুলোতে- টেস্টিস বা অন্ডকোষের সমস্যাজনিত কারণে শুক্রানু তৈরী হয় না অথবা পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরী হয় না। বীর্যবাহি নালীর যে পথে শুক্রানু বা স্পার্ম বের হয়ে আসে, গনোরিয়া, সিফিলিস, যক্ষ্মা ইনফেকশনের কারণে বীর্যবাহি নালীর কোথাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। স্পার্ম বা শুক্রকীটের সংখ্যা, নড়াচড়া বা গুণগত মান খারাপ থাকতে পারে। বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে ইরেকটাইল ডিসফাংশন ও সময়ের আগে বীর্যপাত (Premature Ejaculation) হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো ক্রনিক ডিজিজ বা কোনো মেডিসিন সেবনের জন্যও এ ধরনের সমস্যা হতে পারে। বর্তমানে বন্ধ্যাত্ব কথাটি পরিবর্তন হয়েছে সাব-ফার্টিলিটি দিয়ে। তাদের সন্তান ধারণ হবে না তা নয় বরং সন্তান ধারণের সম্ভাবনা সাধারণ দম্পতির চেয়ে কিছুটা কম। এ জন্য তাদের বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
উপরোক্ত কারণ পর্যালোচনা করে বুঝা গেল, বন্ধ্যাত্বের জন্য স্বামী বা স্ত্রীর যে কারো সমস্যা থাকতে পারে। কাজেই বন্ধ্যাত্ব কোনো একক সমস্যা নয়, এটি হচ্ছে দম্পতির সমস্যা। তাই চিকিৎসার স্বার্থে উভয়কেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাধারণত শুরু করা হয় স্বামীর বীর্য পরীক্ষা দিয়ে। সাধারণত ২-৩ দিন মেলামেশা বাদ রেখে পরীক্ষাটি করা হয়। পুরুষের বীর্য পরীক্ষাটি একটি সহজ, নন ইমভেসিব পরীক্ষা। বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতে এটি হয় এবং একটি মাত্র পরীক্ষা থেকে আমরা মোটামুটি অনেকখানি ধারণা পেয়ে যাই। যদি প্রাথমিকভাবে মনে হয় স্বামীর বীর্যে বিশেষ কোনো ত্রুটি নেই, সে ক্ষেত্রে আমরা গুরুত্ব দিই স্ত্রীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার দিকে। স্ত্রীর পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো সাধারণত ধাপে ধাপে করা হয়। প্রথমত আমরা একটি আলট্রাসনোগ্রাফি করি, সেটা সাধারণত একটি বিশেষায়িত আলট্রাসনোগ্রাফি টিভিএস পরীক্ষা। যার মাধ্যমে একটি প্রাথমিক ধারণা পেয়ে যাই যেমন- জরায়ুর টিউমার, ডিম্বাশয়ের টিউমার ইত্যাদি। আমাদের লক্ষ্য থাকে ওভারিতে ডিমের দিকে, ওভুলেশান এন্ডাকশান দিলে ওভারিতে ফলিকল বড় হচ্ছে কিনা। যদি কারো দীর্ঘদিনের ইনফার্টিলিটি অথবা পূর্বে এপেনডিসাইটিস, একটোপিক প্রেগন্যান্সি বা পেলভিক সার্জারির ইতিহাস বা ডিম বড় হচ্ছে, স্বামীর বীর্য ভালো তবুও গর্ভধারণ না হয়, তখন এসব ক্ষেত্রে ডিম্বানালী বা ফেলোপিয়ান টিউবের পরীক্ষাটি করা হয়। ডিম্বনালী খোলা আছে কিনা সেটা দেখার জন্য ২-৩টি উপায় আছে। যেমন- ১. হিস্টেরোসালপিনগোগ্রাফি (HSG)-রেডিও ওপেক ডাই জরায়ুর মধ্যে পুশ করে এক্স-রে ফিল্মের মাধ্যমে টিউব (প্যাটেনসি) খোলা আছে কিনা দেখা হয়। ২. স্যালাইন ইনফিউশন সনোগ্রাফি (SIS)- একটি সরু ক্যাথেটার জরায়ুর মধ্যে ঢুকিয়ে পানি দেয়া হয়। পানি পাউচ অব ডগলাসে আসলে বুঝায় টিউব প্যাটেন্ট বা খোলা আছে। ৩. এছাড়াও করা হয় Laparoscopy (ল্যাপারোস্কপি)।
চিকিৎসার শুরুতে আমরা স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের ইতিহাস জেনে নিই। দুজনের ক্ষেত্রেই বয়সের গুরুত্ব আছে, তবে মেয়েদের বয়সের গুরুত্ব খুব বেশি সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে। কারণ বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডিমের সংখ্যা এবং গুণগত মান দুটোই হ্রাস পায়। মেয়েদের মাসিকের ইতিহাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি কারো মাসিক নিয়মিত হয়, তাহলে ধরে নেয়া হবে তার ওভুলেশান বা ডিম রিলিজ হচ্ছে। তবে এরও কিছু ব্যতিক্রম আছে। এটুকু অংশকে আলাদা করে অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো করা দরকার। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- মেয়েদের মোটা হয়ে যাওয়া, পেটে, মুখে লোমের আধিক্য, অনিয়মিত মাসিক হওয়া এই গ্রুপটিকে আখ্যায়িত করা হয় পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বলে। পলিসিস্টিক কথাটির অর্থ হচ্ছে ওভারিতে অধিকতর সিস্ট বা ফলিকল। পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম এবং ইনফার্টিলিটি থাকলে আমরা ব্যাপারটা আমলে নিই এবং এ ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসার গুরুত্ব আছে। কিছু মেডিকেল এবং হরমোনাল ডিজঅর্ডার যেমন- ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, হাইপো থাইরয়েডিজম এবং প্রোল্যাকটিন ডিজঅর্ডার থাকলে চিকিৎসার আওতায় আসতে হবে।
বর্তমান যুগে লাইফস্টাইলে অনেক স্ট্রেস এবং এনজাইটির কারণেও বন্ধ্যাত্বের মাত্রা অতীতের তুলনায় বেড়ে গেছে। টেনশন এবং এনজাইটি হলে আমাদের শরীর থেকে কর্টিসল নামে এক ধরনের হরমোন রিলিজ হয়। সেটা শুক্রকীট (স্পার্ম) বা ডিমের ক্ষতি করে। স্ট্রেস কমানোর জন্য যোগব্যায়াম, মর্নিং ওয়াক, গান শোনা, ভালো বই পড়া, কিছু সময় নিজের জন্য বের করা এবং বিভিন্ন রকমের ফিজিক্যাল এক্টিভিটির মধ্যে থাকা ভালো।
অনেক সময় দেখা যায় যে, সামাজিক কারণে, পড়াশুনার কারণে অথবা অন্য কোনো কাজের ডেডলাইন মিট করতে হবে, স্বামী হয়তো একটা শিফটে কাজ করছেন, স্ত্রী আরেকটা শিফটে, হয়তো তাদের ঠিক সময়ে শারীরিক সম্পর্ক হচ্ছে না বলেই গর্ভধারণ (প্রেগন্যান্সি) হচ্ছে না। মেয়েদের সাধারণত মাসিকের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ডিম রিলিজ হয়। সাধারণত বারো থেকে ষোলোতম দিনের মধ্যে। রেগুলার পিরিয়ডে মাসিকের মাঝের ১০তম দিনকে ফার্টাইল পিরিয়ড ধরা হয়। অর্থাৎ, মাসিকের প্রথম ১০ দিন এবং শেষের ১০ দিন সন্তান গর্ভে আসার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু মাঝখানের ১০ দিনকে কাজে লাগাতে হবে। শারীরিক সম্পর্ক প্রতিদিন না হলেও ১ দিন পর পর চেষ্টা করতে হবে। ডিম সাধারণত ২৪ ঘণ্টা বাঁচে আর স্পার্ম বাঁচে ৪৮-৭২ ঘণ্টা। অর্থাৎ, ডিম রিলিজের সময়টিকে ধরতে হবে। আর একটি ব্যাপার হলো, সুস্থ ডিম ও সুস্থ স্পার্ম (শুক্রকীট)। প্রেগন্যান্সির জন্য সিনক্রোনাইজেশান খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে সাইকেলে ডিম এবং স্পার্ম দুটোই ভালো হয় সে সাইকেলে প্রেগন্যান্সি হয়। উল্লেখ্য যে, প্রতিটি মাসিকের সাইকেলে একজন মহিলার প্রেগন্যান্সি হওয়ার চান্স মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ, যাদের সব কিছু ভালো। তাই দম্পতিকে মানতে হবে, সাফল্য না-ও আসতে পারে। তবে চেষ্টায় থাকতে হবে। এজন্য কারো অল্প চেষ্টায় প্রেগন্যান্সি হচ্ছে, কারো বেশি সময় লাগছে। মানুষের শরীরটা পরিবর্তনশীল। কোনো সাইকেলে ডিম ভালো হয়, কোনো সাইকেলে স্পার্ম ভালো হয়। জ্বর, সর্দি বা ভাইরাল ইনফেকশন হলেও স্পার্ম খারাপ হয়। সবকিছু মিলিয়ে রেসপন্স প্রথম মাসে খুব ভালো নাও হতে পারে, সময় লাগতে পারে।
মহিলাদের কিছু হরমোনজনিত সমস্যার কারণে রিপ্রোডাকটিভ এন্ড্রোক্রাইনোলজি এবং ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়াটা জরুরী সেগুলো হচ্ছে- পিসিওএস, এ্যামেনোরিয়া বা মাসিক না হওয়া, বয়োঃসন্ধি অতিক্রম করা শর্তেও মাসিক না হওয়া অথবা পরিণত বয়সের পূর্বে গর্ভধারণ ব্যতিত অন্য কারণে মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। অতিরিক্ত ওজন বা প্রয়োজনের চেয়ে কম ওজনের জন্যও মাসিক বন্ধ থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে জীবনধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে এর সমাধান করা সম্ভব। অপরিণত বয়সে ডিম্বাশয়ের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, ৪০ বছর বয়সের আগে ডিম্বাশয়ের ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার কারণে মাসিক বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা বন্ধ্যাত্ব হতে পারে। এক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সময়সাপেক্ষ কাউন্সিলিং এবং দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন।
আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থি আছে যেখান থেকে হরমোনের নির্দেশনা আসে, সেখানেও সমস্যা থাকতে পারে। কারোর আবার হাইপো থাইরোয়েডিজম বা অতিরিক্ত প্রোল্যাকটিন হরমোনের জন্য বন্ধ্যাত্ব হতে পারে। বন্ধ্যাত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে এন্ড্রোমেট্রিওসিস রোগ। যখন জরায়ুর আভ্যন্তরীন ঝিল্লি বা এন্ড্রোমেট্রিয়ামের অনুরূপ কোষ কলা, জরায়ুর বাইরে পাওয়া যায় এবং বৃদ্ধি পায়। প্রতি মাসে মাসিকের সময় যেমন জরায়ুর অভ্যন্তরীণ হতে রক্তস্রাব হয়, তেমন এন্ডোমেট্রিওসিস হতেও রক্তপাত হয়। মেয়েটি বলে যে, তার মাসিকের পূর্বে খুব ব্যথা হয়, মাসিক শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যথা যায় না। ব্যথা হবে বিধায় সে দুই দিন আগে থেকেই ব্যথার ওষুধ খাওয়া শুরু করে। আমাদের লক্ষ্য থাকে মেয়েটির এন্ডোমেট্রিওসিস আছে কিনা সেটা ডায়াগনোসিস করা। টিভিএস পদ্ধতির মাধ্যমে ডায়াগনোসিস করা সম্ভব। এন্ডোমেট্রিওসিস ডায়াগনোসিস এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে, ধরে নেই বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার একটি ধাপ অতিক্রম করলাম। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৪০-৫০ শতাংশ এন্ডোমেট্রিওসিস পেশেন্ট বা রোগীদের মধ্যে বন্ধ্যাত্ব পাওয়া যায়। এই রোগে তলপেটের অঙ্গসমূহের স্বাভাবিক ও পারস্পরিক বিন্যাস নষ্ট হয়ে যায়। এন্ডোমেট্রিওসিস ডিম্বাশয়কে আক্রান্ত করে চকলেট সিস্ট তৈরি করে। এই রোগের উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে মাসিকের সময় প্রচন্ড ব্যথা, সহবাসকালীন ব্যথা।
চিকিৎসা পদ্ধতির বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের ল্যাপারোস্কপি, হিস্ট্রোস্কপি ডায়াগনোসিস এবং অপারেটিভ কারণে করা লাগতে পারে। ল্যাপারোস্কপি এক ধরনের আধুনিক অস্ত্রোপাচার পদ্ধতি যা দ্বারা পেট না কেটে, পেটে ছিদ্র করে ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে পেটের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রত্যক্ষ করে রোগ নির্ণয় ও অপারেশন করা হয়।
ল্যাপারোস্কপির মতো হিস্ট্রোস্কপি আরেকটি বিশেষ অস্ত্রোপাচার পদ্ধতি যেখানে চিকন সরু ক্যামেরা যোনী পথে প্রবেশ করিয়ে জরায়ুর ভিতরের অবস্থা ভালোভাবে দেখা ও প্রয়োজনে অপারেশন করা যায়।
যদি একটি টিউব খোলা থাকে অথবা শুক্রকীটের নড়াচড়া, সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছু কম থাকে তাহলে Intrauterine insemination (আইইউআই) পদ্ধতিতে গর্ভধারণ করানোর চেষ্টা করা হয়। আইইউআই পদ্ধতিতে সহবাস ছাড়া স্বামীর বীর্যকে সেন্ট্রিফিউজ মেশিনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে অধিকতর চলমান শুক্রকীট স্ত্রীর ডিম ফোটার সময় সরু ক্যাথে টারের মাধ্যমে জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়।
আইভিএফ বা টেস্টটিউব চিকিৎসা একটি আধুনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি। যেখানে মানুষের শরীরের বাইরে ল্যাবরেটরিতে ডিম্বানু ও শুক্রানুর মিলন ঘটিয়ে ভ্রুণ তৈরি করা হয় এবং ভ্রুণটি জরায়ুতে সরু ক্যাথেটারের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা হয়। সাধারণত মহিলাদের দুটি টিউবই বন্ধ থাকলে বা প্রকট আকারে এন্ডোমেট্রিওসিস (স্টেজ ৪) বা স্বামীর স্পার্ম সংখ্যায় অনেক বেশি কম থাকলে আইভিএফ বা টেস্টটিউব পদ্ধতিতে যেতে হয়। অ্যাজোস্পার্মিয়া অর্থাৎ বীর্যে কোনো শুক্রকীট না থাকে সেক্ষেত্রে ইপিডিডামিস (বীর্যবাহী নালী) অথবা অন্ডকোষ থেকে সিরিঞ্জের মাধ্যমে কিছু টিস্যু নিয়ে ল্যাবরেটরিতে মাইক্রোস্কোপের সহযোগীতায় দেখা হয় শুক্রকীট আছে কিনা? থাকলে সেটা দিয়ে আইসিএসআই (ইক্সি) পদ্ধতিতে টেস্টটিউব বেবি বা আইভিএফ-এ যাওয়া যায়। ইক্সি পদ্ধতিতে ইনভারটেড মাইক্রোস্কোপের সহযোগিতায় একটি ডিম্বানুর ভেতরে নিডেল দিয়ে একটি শুক্রানু প্রবেশ করিয়ে ফার্টিলাইজেশন (নিষিক্ত) করা হয়।
আপনারা জানেন যে, সরকার থেকে জনগণ এবং চিকিৎসকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় আমূল পরিবর্তন এসেছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ইনফার্টিলিটি বিষয়ে একটি সাবজেক্ট ওপেন করা হয়েছে এবং প্রতি বছর বেশ কিছু বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসক বের হচ্ছেন। যদিও এ চিকিৎসা বহু বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছে, বর্তমানে সেটি ব্যাপ্তি লাভ করেছে।
সর্বোপরি, একজন বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি বলতে চাই যে, দেশেই যেহেতু বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার সুব্যবস্থা রয়েছে, কালক্ষেপন না করে প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠার সাথে ধৈর্য্য ধরে চিকিৎসা নিয়ে সাফল্যের পথে এগিয়ে চলুন।
.jpeg)
ডাঃ রওশন আরা
বন্ধ্যাত্ব, প্রজনন হরমোন, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ
ল্যাপারোস্কপিক এবং হিস্টেরোস্কপিক সার্জন
এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনি অ্যান্ড অবস)
এফসিপিএস (রিপ্রোডাকটিভ এন্ডোক্রিনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি)
সহযোগী অধ্যাপক (ডিএমসিএইচ)
🏥 চেম্বার: ১
ইবনে সিনা মেডিকেল ইমেজিং সেন্টার জিগাতলা বাস স্ট্যান্ড,ধানমন্ডি।
বাড়ি নং-৫৮, রোড নং-২/এ, ধানমন্ডি আ/এ, ঢাকা-১২০৯
📞 সিরিয়ালের জন্য: ০৯৬১০০০১৬২৫
📞 মোবাইল: ০১৩২২-০০২০৮৮-৯
রোগী দেখার সময়: সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা
(শুক্রবার বন্ধ)
🏥 চেম্বার: ২
রাজশাহী: ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক এন্ড কনসালটেশন সেন্টার
সিএন্ডবি মোড়, রাজপাড়া, রাজশাহী।
রোগী দেখার সময়: শুক্রবার (সকাল ১০ টা থেকে ৫ টা)

No comments